২০২৩ সালের হাজীর হজ্বের অভিজ্ঞতা

 এই বছরের হজের আর মাত্র দুই মাস বাকি। ২০২৩-এ আমার হজ করার অভিজ্ঞতা লিখছি যদি এই অভিজ্ঞতার আলোকে কারো প্রস্তুতিতে কোনো সুবিধা হয়। লেখাটি মূলত ট্রাভেল ও লজিস্টিকস বিষয়ক। এটি ফিকহী আলোচনা নয়। ইবাদত ও ইমোশনের প্রকাশও নয়।

১৭ এপ্রিল ২০২৩
সৌদি ভিসা বায়ো এপের মাধ্যমে বায়োমেট্রিক দেয়ার নির্দেশনা পাই। ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে গিয়ে দেখি কোনো অবস্থায় সব আঙ্গুলের ছাপ নেয় না। শেষে কালো ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করার মাধ্যমে সহজে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে পারি। কোনো কোনো মোবাইল ডিভাইস থেকে নাকি সহজে ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়া যায়।
০১ জুন ২০২৩
ভিসা পাই। আমি মালয়েশিয়া ছিলাম বলে আমার উপস্থিতি ছাড়া বাংলাদেশ থেকে ভিসা পাবো কিনা চিন্তায় ছিলাম।
০৮ জুন ২০২৩
কুর্মিটোলা হসপিটালে মেডিক্যাল টেস্টের রিপোর্ট দিয়ে আসি ও টিকা নেই। এক দিনের মধ্যে মেডিক্যাল রিপোর্ট আপডেট হওয়ার কথা। কিন্তু, কয়েক দিনেও আপডেট নাই। ১৩ জুন আবার যাই হসপিটালে সব ডকুমেন্টস নিয়ে। বলার পর তাদের কাছে থাকা আমার ডকুমেন্টস খুঁজতে থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পায় নাই। শেষে আমার ডকুমেন্টস আবার দেখে উপস্থিত সিস্টেমে আপডেট দেয় ও মেডিক্যাল রিপোর্টের কপি দেয়।
১৭ জুন ২০২৩
হজ ফ্লাইটের আনুমানিক ছয় ঘণ্টা আগে হজ ক্যাম্পে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। আমরা শেষের দিকের দল ছিলাম বলে হয়ত ভিড় ছিল না। সহজে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করি। হজ ক্যাম্পে টয়লেট পরিষ্কার ছিল। নামাজের জায়গায় এহরামের কাপড় পড়ার ব্যবস্থা ছিল।
লাগেজ দড়ি দিয়ে বাঁধা নিষেধ ছিল। যারা বেঁধেছিলেন তাদের দড়ি খুলতে হয়েছিল।
চেক-ইন ও বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন হজ ক্যাম্পে।
ওখান থেকে বাসে করে এয়ারপোর্ট। অপেক্ষা, নামাজ, সৌদি ইমিগ্রেশন ও অপেক্ষা।
মতভেদের বিষয়াদি এখান থেকে শুরু। নামাজ সংক্ষিপ্ত হবে কি না? নামাজ মাগরিব এশা পরপর নাকি না? ইত্যাদি।
সৌদি ইমিগ্রেশনের পর অপেক্ষার জায়গায় নামাজ, পানি, টয়লেট ও বসার ব্যবস্থা আছে। ব্যবস্থা খারাপ না। "ট্রাভেল জায়নামাজ" এখান থেকে কাজে লাগা শুরু।
মেঘের কারণে ফ্লাইট কিছুটা দেরিতে ছাড়ে। ফ্লাইনাসের মান ভাল মনে হয়েছে। লেগ স্পেস ভাল ছিল। বসার ব্যবস্থা ছিল সিট নম্বর অনুযায়ী। খাবারের মান ঠিক আছে। তবে কাউকে দুইবার খাবার দিয়েছে, অধিকাংশকে একবার। "বাসা থেকে কিছু খাবার আনাতে আমাদের অসুবিধা হয়নি"। আমি মালয়েশিয়া থেকে বিস্কুটস এনেছিলাম, যা কোনো কাজে লাগেনি।
১৮ জুন ২০২৩
জেদ্দা এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে নেমে সরাসরি বাসে। অপেক্ষা। ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা নাই যে কাউকে অবস্থান সম্পর্কে জানানোর। বাস ছাড়ল মক্কার উদ্দেশ্যে। বহুক্ষণ ঘুরার পরেও দেখি বাস এয়ারপোর্টের পাশে। ড্রাইভার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। এরপর বাস নষ্ট হল। আসল পুলিশ। বাস পরিবর্তন করা হল।
বাসের মধ্যে নামাজ পড়লাম। কিন্তু, দিক নিয়ে কনফিউশন। কোনদিকে কিবলা! ইন্টারনেট যেহেতু নাই, মোবাইল দিয়ে দিক ঠিক করার উপায় ছিল না। আমার কাছে কম্পাস ছিল তা দিয়ে দিক ঠিক করি। অন্যদের প্রশ্ন, কম্পাসের ব্যবহার ঠিক আছে কিনা।
মাটির টুকরো দিয়ে তৈয়াম্মুম কিভাবে করতে হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন ও কনফিউশন।
**বাসের মধ্যে টয়লেট আছে। আগের বাসে একজন সেটার দরজা খুলেন। পরিণতি হচ্ছে এসি বাসে টয়লেটের গন্ধ। বাসের টয়লেট ব্যবহারের চিন্তা না করলেই ভাল।**
মক্কা পৌঁছানোর পর প্রথম কাজ হোটেল খুঁজা। আমাদের হোটেল যেহেতু সাধারণ মানের, ড্রাইভার হোটেল খুঁজে পায় না। হাজিরা স্বাভাবিক কারণেই বিরক্ত। নানা জনের নানা কথা। **সেগুলো না শোনা, উত্তর না দেয়া, আলোচনায় একদমই অংশ না নেয়া ও পুরোপুরি চুপ থাকাটা উত্তম।**
হোটেল খুঁজে পাওয়ার পর রুমে যাওয়া। **এখান থেকে শুরু অন্যের কষ্টের কথা চিন্তা করে নিজের সুবিধায় ছাড় দেয়ার চর্চা।** উত্তম নীতি হচ্ছে **সহনশীলতা, মেনে নেয়া, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা, অন্যের জন্য ছেড়ে দেয়ার ফল হিসেবে আল্লাহর তরফ থেকে উত্তম প্রতিদান আশা করা, পারলে অন্যের উপকার করা, অন্যের সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া, আর কিছু করতে না পারলে চুপ থাকা।**
আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের দলের সবাই ভাল মানুষ ছিলেন।
হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে যাই উমরার জন্য।
আমাদের দলনেতা - মিরপুর জনতা হাউজিং মসজিদের ইমাম - একজন অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞন ব্যক্তি। ২৩ জনের দলের সবার প্রতি তিনি যত্নবান ছিলেন। তার অনেক বছরের হজ করার অভিজ্ঞতার কারণে দলের সবার কথা চিন্তা করে সহজ পন্থা তিনি অবলম্বনের চেষ্টা করেছেন সবসময়। বৃদ্ধ ও নারীদের ব্যাপারে তিনি বিশেষ ভাবে সবসময় চিন্তিত ছিলেন। সবসময় সবাইকে উদ্বুদ্ধ রাখার ও হজের আবহের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছেন।
**মক্কাতে গরম। ঠাণ্ডা পানি বা পানীয় খাওয়ার এক তীব্র চাহিদা থাকে। প্রচণ্ড গরমে ঠাণ্ডা খাওয়ার ফলাফল হতে পারে তীব্র কাশি। ঘামের কারণে বা অন্য কোনো কারণেও হতে পারে কাশি। আমি বেশ কিছু strepsils লজেন্স নিয়ে গিয়েছিলাম যা ভাল কাজে দিয়েছে।**
রাস্তায় বিনামূল্যে পানি বিতরণ করে। আর মসজিদুল হারামে জমজমের পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা তো আছেই।
STC মোবাইল সিম কিনলাম। সম্ভবত ১০৫ রিয়াল, এক মাসের প্যাকেজ। কত শত আন্তর্জাতিক কল মিনিট ও কত জিবি ডাটা ভুলে গেছি। অনেক টাকা। এত মিনিট বা ডাটার কাজ নাই। কিন্তু, অন্য কোনো কার্যকর অপশন নাই। নেটওয়ার্ক ভাল।
২১ জুন ২০২৩
কোরবানি কোথায় হবে এই নিয়ে আমাদের দলের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে আমরা নিজেরা কোরবানির পশু জবাই করবো। কারণ, একটি মত হচ্ছে যে সৌদি যে ব্যবস্থা আছে তাতে আসলে ঠিক কখন কুরবানি হয় তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আর অন্য কাউকে টাকা দিলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেটা জানা গেল, কুরবানির টাকা নিয়ে প্রতারণার যথেষ্ট উদাহরণ আছে। যেমন, ২৫ জনের টাকা নিয়ে হয়ত ২০ জনের কোরবানি দিল, পশুর প্রকৃত দামের অতিরিক্ত নিল, ইত্যাদি।
কোরবানির পশু দেখতে আমাদের দলনেতার নেতৃত্বে এক বাসায় গেলাম। বাসার ছাদে অনেক দুম্বা ও কিছু খাসি। দাম ঠিক হয়। আমিসহ চারজনকে কোরবানির দায়িত্ব দেয়া হয়।
**কাজটা ঝামেলার।** আমি একা হলে সৌদি ব্যবস্থায় আস্থা রাখতাম।
২৩ জুন ২০২৩
জুমার দিন। ১২.২০ এর দিকে নামাজের সময়। হোটেল থেকে বের হই ১০-টার দিকে। হারাম থেকে আধা কিলোমিটার দূরে রাস্তার উপর জায়গা পাই। শুরুতে বাস স্টপের ছাউনির ছায়া ছিল। সূর্য অন্য দিকে যাওয়ার সাথে সাথে তীব্র রোদ। মহব্বত ভাইয়ের মাধ্যমে UCBL Taqwa-র ছাতা ভাল কাজে দেয়। একটি ছাতা পাশে বসা তুরস্কের একজন বয়স্ক নারীকে দেই।
তীব্র গরম। বিনামূল্যে পানি বিতরণ চলছিল যা কিছুটা কমফোর্ট দেয়।
ঘাজা এলাকা থেকে হারামের যাওয়ার রাস্তায় নিয়মিত বিনামূল্যে পানি বিতরণ হত। মাগরিবের পর চা/কফি (হজের পূর্ব পর্যন্ত) ও এশার পর খাবারের প্যাকেট (ব্রেড, জুস্, খেজুর)।
**ছাতা, সানগ্লাস ও ট্রাভেল জায়নামাজ** অতি প্রয়োজনীয় জিনিস।
মক্কার গরমে ঠান্ডা লাবান অন্য রকম তৃপ্তিদায়ক। ম্যাংগো ফ্লেভার হলে তো আর কথা নাই। মিনা যাবার আগের দিন হারাম থেকে আসার পর এক বোতল ঠান্ডা লাবান খেলাম। ফলাফল কাশি ও গলা বসে যাওয়া। অবশ্য মিনার দিন বিকেলে ঠিক হয়ে যায়।
২৬ জুন ২০২৩
মাগরিবের পর মিনা রওয়ানা দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। তবে বাস কখন আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। রাত ২.৫০ মিনিটে বাস ছারে। মিনা পৌঁছাই সাড়ে তিনটার দিকে। আনুমানিক ১১ কিলোমিটার রাস্তা।
মিনার তাঁবুতে লোকের সংখ্যা থেকে বিছানা কম। আমরা "ডি" ক্যাটাগরির। একটি ম্যাট্রেসের সাথে আরেকটির ফাঁক নেই। ম্যাট্রেসের সাইজ ঠিক পিঠের সমান।
আমাদের সুবিধা ছিল যে আমাদের দলনেতা ছোট একটি তাঁবু আমাদের জন্য নিশ্চিত করেন যেটাতে শুধু আমাদের দলের লোকজনই ছিলেন। নারীদের জন্য বিছানা চাঁদর দিয়ে তাঁবুর মধ্যে একটা পার্টিশন করা হয়।
মিনাতে তিন বেলা খাবার দেয়। খাবারের মান যথেষ্ট ভাল। খাবার কম খেলে ভাল। বিকালে চা আছে, খুঁজে নিতে হয়। না খেলে ভাল। আমি খেয়েছি। **পর্যাপ্ত টয়লেট আছে। পরিবেশের তুলনায় পরিষ্কার। তবে টয়লেটে কম গেলেই ভাল।** আমাদের দলের অভিজ্ঞ একজন বাহিরে একটি জায়গা খুঁজে পায় যেখানে গোসলেরও ব্যবস্থা আছে। নারীদের বিষয়টি জানি না।
**মিনাতে কোনো কিছু কেনার সুযোগ নাই।** পানি খুঁজে না পেলে মুশকিল। আমরা কিছু ফল নিয়ে এসেছিলাম যা সবাই আগ্রহ নিয়ে খেয়েছে। কিছু শুকনা খাবারও এনেছিলাম, সেগুলোর ব্যাপারে কারো আগ্রহ ছিল না।
**বিশ্রাম নেয়া ও প্রয়োজনীয় ইবাদত করা ছাড়া আর কিছু করার নাই। মূলত মানসিক প্রস্তুতি নেয়া এখানে কাজ।**
মাগরিবের পর হাটতে হাটতে অনেক দূর গেলাম। আফ্রিকার অনেকে তাঁবুতে জায়গা পাননি। রাস্তায় অবস্থান করছিলেন। তাদের ওখানে দোকান ছিল, তবে প্রচণ্ড ভিড়।
রাত মনে হয় ১০টা বা ১১টার দিকে আরাফাহয় যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়।
কখন বাস আসবে, কোন রাস্তায় বাস আসবে, কনফিউজিং। এক রাস্তায় অপেক্ষা করছিলাম আমরা, পরে জানা গেল ভুল রাস্তা। অন্য রাস্তায় গেলাম। বাস আসলো, হুড়োহুড়ি। আমাদের বাস কি না, উঠবো কি উঠবো না কনফিউশন। উঠলাম। কয়েকজন বসার জায়গা পাননি।
**ধর্য্য ধরা ও চুপ থাকা সর্বোত্তম। পারলে উপকার করলাম, না হলে চুপ।**
রাত ১.৫০-এ বাস ছাড়লো। দেড় ঘণ্টা পর আরাফাহর তাঁবুতে পৌঁছলাম।
২৭ জুন ২০২৩
আরাফাহর তাঁবু বড়, প্রচুর মানুষ, বিভিন্ন দল একসাথে। বিছানার সাইজ মিনার থেকেও ছোট। কাইত হয়ে শোয়ার মত, সংখ্যা মানুষের তুলনায় কম। স্বাভাবিক কারণেই জায়গা দখলের একটি গুরুত্ব। **খারাপ ব্যবহারের মানুষ আছেন। যতটুকু সম্ভব না দেখার চেষ্টা করা ও দোয়ার বাহিরে মুখ একেবারেই বন্ধ রাখার কোনো বিকল্প নেই। আমার মনে হয়েছে কোনো ভাল কথাও কারো সাথে না বলা উত্তম এই সময়ে।**
রাতে এসির বাতাসে আরামদায়ক পরিবেশ। কিন্তু, সূর্য উঠার পর থেকে তাপ বাড়তে থাকে। একেক জন একেক ভাবে এসির বাটন চেপে এসি আর কাজ করে না। গরম বৃদ্ধি পায়। গেঞ্জাম। **সম্পূর্ণ চুপ থাকা আবশ্যক।**
ফজরের পর একটু ঘুম। দশটার দিকে মনে হল মসজিদ নামিরাহর ওখানে যাই। শুরুতে বুঝতে পারি নাই, পরে বুঝলাম আমাদের থেকে কাছে। আধা ঘণ্টা হাঁটা। গিয়ে দেখি ঢুকার কোনো অবস্থা নাই। প্রচণ্ড ভিড় ও পুলিশ ঢুকতে দিচ্ছে না। আর বাহিরে প্রচণ্ড গরম। এর মধ্যেও প্রচুর হাজি। তাঁবুতে ফিরে আসি।
হজের খুৎবা শুরু হল। নামাজ। **শুরু হল তাঁবুর মধ্যে গেঞ্জাম। দুই রাকাত না চার রাকাত। আমার মতে এমন পরিস্থিতিতে একদমই চুপ থাকাটা উত্তম। সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে চুপচাপ নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করা।**
সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবার দিয়েছিল। **কম খেলে ভাল। টয়লেট আছে। পরিষ্কার। তবে লম্বা লাইন। আরাফার দিন টয়লেটের লাইনে সময় ব্যয় করার কোনো মানে নাই।**
তাঁবুর মধ্যে হজের পরিবেশ বোধ হচ্ছিল না। জাবালে রাহমাহর দিকে হাঁটা দেই। প্রচণ্ড রোদ। তবে এই হাঁটাটা অতি উত্তম সিদ্ধান্ত ছিল। আমাদের দল থেকে আমি একাই গেলাম। একা যাওয়াটাই সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাস্তায় বিনামূল্যে পানি ও খাবারের প্যাকেট বিতরণ করে। হুড়োহুড়ি-ধাক্কাধাক্কি থাকে, যা হওয়াটা স্বাভাবিক। দুপুরের পরে স্টক ছিল না / বিতরণ বন্ধ হয়ে যায়। বিকালে তাঁবুর ওখানে আইসক্রিম ও চা দেয়।
সিদ্ধান্ত হয় যে ছয়টার দিকে আমরা বাসে উঠবো। সূর্যাস্তের পরপর বাস ছাড়লে নয়টার মধ্যে মুজদালিফা পৌঁছবো। বিশ্রাম নিয়ে ফজরের পরপর জামারাত।
**বাস ছাড়লো মনে হয় নয়টার দিকে। মুজদালিফা পৌঁছলাম আড়াইটার দিকে। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। পানি নিয়ে উঠি নাই। গলা শুকিয়ে অবস্থা খারাপ। পানির কোনো রকম কোনো ব্যবস্থা নাই।**
বাস থেকে নামার কোনো উপায় নাই। আর নামলে দল ছাড়তে হবে। আর কোন দিক থেকে কোন দিকে যাবো তাও তো জানি না, যদিও সবার দিক একদিকে। বাসের সিঁড়িতে কোনো মতে বসার একটা জায়গা পেয়েছিলাম।
বাসে যে রাস্তা পার হতে সাত ঘণ্টা লেগেছে, হাঁটলে নাকি দুই ঘণ্টা লাগে।
মুজদালিফা পৌঁছে পাথর সংগ্রহ করলাম। গেলাম জামারাত শুরুর পয়েন্টে (একটি ফ্লাইওভারের নিচে)। অনেকটুক হাঁটা। বাস ড্রাইভার তার নিজের মত করে নামিয়ে দিয়েছে। মাগরিব, এশা পড়লাম। খাবারের তেমন ব্যবস্থা নাই। সঙ্গে আনা হালকা খাবার ভরসা। **আরাফার তাঁবুতে খাবার দিয়েছিল, আমরা আনি নাই। না আনাটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। বোঝা যত কম তত ভাল।**
ফজরের আগে টয়লেটে গেলাম। পানি নাই ও পস্রাবের তীব্র দুর্গন্ধ। তবে ওযুর পানি ছিল। ফজরের নামাজ পরে জামারাতে শয়তানকে পাথর মারার উদ্দেশ্যে হাঁটা। সেটা এক অন্য রকম পরিবেশ ও উদ্দীপনা। রীতিমত যুদ্ধের জোশের একটি আবহ। **সম্ভবত মোটের উপর দুই ঘণ্টার হাঁটা। এই সময় ব্যাগ হালকা থাকা ও পোটলা-পুটলি পারলে না থাকাটা জরুরি। ব্যাগ যত ভারী, কষ্ট তত বেশী।** দড়ি দেয়া ব্যাগের পরিবর্তে কাপড়ের স্ট্রেপের হালকা ব্যাগ হলে কাঁধে দড়ির চাপ এভোয়েড করা যাবে।
পাথর মেরে তৃপ্তির সাথে ঠাণ্ডা পানীয়।
**হোটেল যাওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজছিলাম। অস্বাভাবিক দাম। প্রতি জন ২০০ রিয়াল চাচ্ছিল অল্প একটু রাস্তার জন্য। পরে একটি বাস পাই। প্রতি জন ১০০ রিয়াল।**
হোটেল পৌঁছে আমার দায়িত্ব ছিল কোরবানি দিতে যাওয়ার। কোরবানি দেই, চুল ফেলি। চুল ফেলা বাংলাদেশী অদক্ষ সেলুনে দশ রিয়াল। অন্য খানে বিশ রিয়াল। স্বাভাবিক সময়ে সবখানে দশ রিয়াল।
দলের দুর্বলদের কথা বিবেচনায় নিয়ে মিনাতে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে হোটেল থেকে জামারাতে যাওয়ার দলের সিদ্ধান্ত হয়। তবে দুই-তিনজন মিনাতে ফিরে যান।
পরের দিনগুলো ছিল সহজ।
তৃতীয় দিন জামারাত থেকে টানেল দিয়ে হেঁটে আসি। আড়াই ঘন্টার মত লেগেছিল।
৩ জুলাই ২০২৩
আব্দুল্লাহ শরীফ ভাই কফি খাওয়ালেন। হজে আসার পর প্রথম কফি খেলাম। তিনি ও মহব্বত ভাই নিয়ে গেলেন তাদের হোটেলে। তাদের দলের বিদায়ী খাবার আয়োজন।
৯ জুলাই ২০২৩
তাইফ গেলাম। তাইফ যাওয়ার পথ দুইটি। একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার মত, কিন্তু খাঁড়া পথ। দলের একাধিক জন উচ্চতায় ভয় পান দেখে আমরা সমতল রাস্তা দিয়ে যাই।
উমরাহ করলাম।
১৪ জুলাই ২০২৩
কাকিয়ার পাইকারি বাজারে গেলাম। জিনিসপত্রের দাম অনেক কম। হয়ত কিছু টাকা বাঁচতো যদি মক্কা আসার পরপরই এখান থেকে প্রয়োজনীয় ডিম, ফল, জুস, ইত্যাদি কিনে নিতাম।
২০ জুলাই ২০২৩
**মদিনা যাই। আমাদের দলের একজন তার লাগেজ হারান, যেটাতে স্বর্ণ ছিল। মক্কাতে বাসে উঠার সময় একজন তাঁকে বলেন যে 'আপনি উঠে যান, আমি তুলছি'। পরে আর সে লাগেজ পাওয়া যায় নাই। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজও গায়েব।** বাংলাদেশ হজ মিশনও কোনো সাহায্য করতে পারে নাই।
মদিনায় হোটেলে পৌঁছানোর পর জানা গেল যে আমাদের রুমগুলো এখনো খালি হয়নি। অবস্থানরত পাকিস্তানী হাজীদের ফ্লাইট একদিন ডিলে হয়েছে, যার কারণে তাঁরা রুম ছাড়বেন না। ফলাফল, আমাদের রুম নাই। গেঞ্জাম। হোটেলের সৌদি প্রতিনিধির ভাষ্য, তিনি "সৌদি", তার সাথে গ্যাঞ্জাম করে লাভ নেই।
অনেক রাতে অন্য এক হোটেলে ওই রাতের জন্য আমাদের ট্রান্সফার করা হল।
২৮ জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত মদিনায়।
প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে নববীতে পড়া। মাঝখানে একদিন নির্ধারিত সময়ে রিয়াদুল জান্নাহতে যাওয়া হয়। গোছানো সিস্টেম। তবে, সুযোগ একবার। মিস হলে শেষ। শুনেছি একটি গ্রুপ এ.এম. ও পি.এম.-এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিল। পুরুষ ও মহিলাদের ভিন্ন সময়।
২৯ জুলাই ২০২৩
মদিনা থেকে ঢাকা ফ্লাইট।
কত কেজি মালামাল আনা যাবে এই বিষয়ে পরিষ্কার কোনো নির্দেশনা নেই। চেক-ইনে কোনো মাপামাপি নাই, সব নিচ্ছে। কিন্তু সিকিউরিটি চেকের আগে ফ্লাইনাসের এক স্টাফ ঝামেলা করা শুরু করলো। হাজীদের এক মহা পেরেশানি।
প্লেনে বসার ক্ষেত্রে এসাইন্ড সিট নম্বর ফলো করা হলো না। ফলাফল, গেঞ্জাম। **কোনো কোনো হাজী অন্য হাজীর সাথে খারাপ ব্যবহারও করলেন।**
ঢাকা এয়ারপোর্টে লাগেজ পেতে সমস্যা হয়নি।
**পরিশেষে**
হজ জীবনে একবার করতেই হবে। সামর্থ থাকার পরও হজ না করা, কিন্তু বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ানো বা লাক্সারি আইটেমে অর্থ ব্যয় কিভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে! জীবনে ব্যস্ততা ও অজুহাতের শেষ নেই। এর মধ্যে করতে হবে।
হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত বিষয় আমার মনে হয়েছে প্রস্তুতি। শারীরিক, মানসিক ও জ্ঞানগত।
সাধারণ ভাবে হজ খুব একটা শারীরিক ভাবে কঠিন মনে হয়নি। সমস্যা এতটুকুই যে অল্প সময়ে ঘুম-বিশ্রামের তেমন সুযোগ না পেয়ে ভ্রমণ করতে হয় বা অনেকগুলো কাজ করতে হয় ও অনেকটা পথ হাটতে হয়। প্রস্তুতি হিসেবে ভাল হয় হজের কয়েক মাস আগে থেকে নিয়মিত হাঁটা। হজের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে দোয়া মূলত একটাই ছিল যেন সুস্থ থাকি। হজের কাজের দিনগুলো অল্প কয়দিন। এর মধ্যে অসুস্থ হওয়া মানে মূল কাজ ঠিক ভাবে করা যাবে না। অসুস্থ হলে নিজের পাশাপাশি অন্যরাও পেরেশানিতে পরবে।
**জ্ঞানগত প্রস্তুতির অভাব গুরুতর মনে হয়েছে। যেমন, কোন কাজের পর কোন কাজ, কি দোয়া বা সূরা, কোনটা সুন্নাহ ও কোনটা ফরজ, ইত্যাদি। কয়টা পাথর? প্রতি ওয়াক্তে জানাজা হয়। সেটারই বা নিয়ম কি? ইত্যাদি। পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে উপস্থিত এই জ্ঞান অর্জন সম্ভব না। দল নেতা বা অন্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা লাগে। দল নেতা ভাল না হলে বা দল ছিন্ন হয়ে গেলে পুরাই বরবাদ।**
**তায়াম্মুম ও অতি অল্প পানিতে বা পানি না ছিটিয়ে ওযু করতে জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান।**
**নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা, খাদ্যের প্রভাব ও ওযু ধরে রাখার টেকনিক জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু খাবার ওযু ধরে রাখার জন্য সমস্যা।**
**যারা "পজিশনের ভারে" আক্রান্ত, তাদের জন্য হয়ত হজ একটু কঠিন** কারণ তার পজিশনের কোনো গুরুত্ব সেখানে নেই। যেমন, একজনের কথা জানলাম যিনি সকাল ১১টা বাজে রেস্টুরেন্টে ডিম না পেয়ে রেগে গেলেন এবং নিজের বড় পরিচয় জানালেন।
বাংলাদেশ থেকে অধিক জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার হয়ত প্রয়োজন নাই। মক্কা-মদিনাতে দরকার মত কিনতে পাওয়া যায়। লাগেজ যত হালকা থাকে ততই ভাল মনে হয়েছে।
**কথা যত কম বলা যায় ততই ইবাদতের জন্য ভাল মনে হয়েছে। ছাড়ের মানসিকতার বিকল্প নেই। অন্যথায় নিজেরই পেরেশানি ও ইবাদতের ক্ষতি। পারলে অন্যের উপকার করা, না পারলে চুপ থাকা বা ওই জায়গা ত্যাগ করা। হজের সময় ইবাদতের বিষয়ে অন্যকে পরামর্শ না দেয়া ও অন্যের উপর নির্ভর না করা উত্তম পন্থা মনে হয়েছে। হজের দিনগুলোতে কোনো বিষয়ে কারো কাছে অভিযোগ তো করাই যাবে না। অন্য কেউ অসুবিধা সৃষ্টি করলে সেটি মনে না নেয়া, বিশেষেত প্রতিক্রিয়া না দেখানো গুরুত্বপূর্ণ।**
আল্লাহ আমাদের হজ কবুল করুন, হজের শিক্ষা ধারণ করার তৌফিক দিন, ও যারা এখনো হজে যেতে পারেনি তাদের যাওয়ার সুযোগ করে দিন।
Note: **.......** এই মার্কগুলো আমি ব্যাক্তিগতভাবে দিয়েছি যেন এই অংশগুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়েন। আল্লাহ্‌ Mezbah Uddin Ahmed ভাইকে বারাকাহ দান করুন।

Comments

Popular posts from this blog

রাসুল (সাঃ) রাওজা জিয়ারতের ক্ষেত্রে করনীয় ও বর্জনীয়

দোয়া

নবিজির প্রতি ভালোবাসার তীব্রতা