দোয়া

 ৩ টি পদ্ধতিতে দু‘আ করা যায়। আজ আমরা সেগুলো দলিলসহ জানবো, ইনশাআল্লাহ। কোনো আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির কাছে দু‘আ চাওয়া বৈধ কি না, সেটিও জানবো।

❖ দু‘আ বলতে আসলে কী বুঝায়?
আরবি দু‘আ শব্দটির অর্থ হলো ডাকা, আহ্বান করা, প্রার্থনা করা ইত্যাদি। পরিভাষায় কারও কাছে কোনো কিছু চাওয়া বা প্রার্থনা করাকে দু‘আ বলে।
❖ দু‘আ করার পদ্ধতি:
দু‘আ কয়েকভাবে করা যায়।
১) কেবল মনে মনে কোনোকিছু কামনা করা। যেমন: আমরা কুরআনে পাই, যখন বাইতুল মাকদিস মুসলিমদের কিবলা ছিলো, তখন নবিজি বারবার আকাশের দিকে তাকাতেন আর মনে মনে খুব চাইতেন, যেন কা’বাকে কিবলা নির্ধারণ করা হয়। আল্লাহ বলেন—
قَدۡ نَرٰی تَقَلُّبَ وَجۡهِکَ فِی السَّمَآءِ ۚ فَلَنُوَلِّیَنَّکَ قِبۡلَۃً تَرۡضٰهَا ۪ فَوَلِّ وَجۡهَکَ شَطۡرَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ؕ وَ حَیۡثُ مَا کُنۡتُمۡ فَوَلُّوۡا وُجُوۡهَکُمۡ شَطۡرَهٗ ؕ
‘‘অবশ্যই আমরা আকাশের দিকে আপনার বারবার তাকানো লক্ষ্য করছি। সুতরাং অবশ্যই আমরা আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেবো, যা আপনি পছন্দ করেন। অতএব, আপনি মাসজিদুল হারামের দিকে চেহারা ফিরান। আর, তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তোমাদের চেহারাগুলোকে এর দিকে ফেরাও।’’ [সুরা বাকারাহ, আয়াত: ১৪৪]
(আল্লাহ নিজেই ‘‘আমরা’’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাই কুরআনের অনুবাদকগণও ‘‘আমরা’’ শব্দেই অনুবাদ করেন। এখানে কোনো ভুল নেই। এই ‘‘আমরা’’ দিয়ে সম্মান প্রকাশ করা হয়। আল্লাহ তাই, নিজের ক্ষেত্রে কুরআনের অনেক স্থানে ‘‘আমরা’’ শব্দ ব্যবহার করেছেন)
.
২) সাধারণভাবে মুখ ফুটে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া। যেমন: কেউ আমাদের জন্য ভালো কিছু করলে আমরা বলি—জাযাকাল্লাহ খাইরান (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন)। [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ২০৩৫; হাদিসটি সহিহ]
.
এটাও কিন্তু দু‘আ, যা আমরা মুখ ফুটে বলি, কিন্তুু হাত উঠাই না। আমরা হাদিসে নবিজির মুখনিঃসৃত যেসব দু‘আ দেখি, এর অধিকাংশই এই ক্যাটাগরির দু‘আ। কারণ নবিজির প্রায় সকল কাজ ছিলো দু‘আ দিয়ে সুসজ্জিত।
৩) হাত উঠিয়ে বিশেষভাবে দু‘আ করা। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত উঠিয়েও দু‘আ করতেন। যেমন: বিশুদ্ধ হাদিসে আমরা দেখি, বদর যুদ্ধের দিন নবিজি হাত তুলে দু‘আ করেছেন। [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৪৪৮০]
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘নিশ্চয়ই তোমাদের রব্ব চিরঞ্জীব ও মহান দাতা। বান্দা যখন তাঁর নিকট দুই হাত তুলে, তিনি তা শূন্য অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।’’ [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ১৪৮৮; হাদিসটি সহিহ]
সুতরাং, এই তিন পদ্ধতিতেই দু‘আ করা বৈধ। তবে, প্রথম পদ্ধতিটা সেই অর্থে দু‘আ নয়, বরং মনের বাসনা মাত্র। অবশ্য আল্লাহ তা‘আলা অনেক সময় মনের বাসনাকেই পূরণ করে দেন; মুখেও বলতে হয় না।
❖ দু‘আ দুই রকমের হয়ে থাকে।
[১] যেকোনো ইবাদতই এক রকম দু‘আ।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমাদের কেউ যখন নামাজরত অবস্থায় থাকে, তখন সে তার রবের সাথে মুনাজাতরত থাকে।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৪১৬
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘সর্বোত্তম দু‘আ হলো, আলহামদুলিল্লাহ।’’ [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৩৮৩; ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ৩৮০০; হাদিসটি হাসান]
এজন্য আলিমগণ বলেন, আল্লাহর ইবাদত মানেই এক ধরনের দু‘আ। ‘‘আলহামদুলিল্লাহ’’ শব্দটিতে কিছু চাওয়া হয় না, তারপরও হাদিসে এটিকে দু‘আ বলা হয়েছে।
.
[২] সরাসরি আল্লাহর কাছে চেয়ে দু‘আ। এই দু‘আ তো আমরা সবাই চিনি। অর্থাৎ, যে বাক্যের দ্বারা আমরা আল্লাহর কাছে কিছু চাই। যেমন: রাব্বিগফিরলি (হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন), আল্লাহুম্মাহদিনি (হে আল্লাহ! আমাকে হিদায়াত দিন), রাব্বি যিদনি ইলমা (রব, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন)।
.
❖ আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে দু‘আ করা:
.
আল্লাহ ব্যতীত কোনো কিছুর নিকট দু‘আ করা হারাম। হোক সেটি কোনো মূ*র্তি কিংবা হোন তিনি কোনো পির-বুযুর্গ, নবি বা আউলিয়া।
.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন—
.
وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
.
‘‘তুমি আল্লাহ ছাড়া এমন কাউকে ডেকো না, যে না তোমার উপকার করতে পারবে আর না তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে। তুমি যদি এমন করো, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো বিপদে ফেলেন, তাহলে তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চান, তাহলে কেউ তাঁর অনুগ্রহকে প্রতিহত করতে পারবে না। স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান, তাকেই তিনি স্বীয় অনুগ্রহ দান করেন; তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।’’ [সুরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬-১০৭]
.
অন্যত্র এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
.
فَادۡعُوا اللّٰهَ مُخۡلِصِیۡنَ لَهُ الدِّیۡنَ
.
‘‘অতএব, দ্বীনকে (ইসলামকে) আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে শুধু আল্লাহকেই ডাকো।’’ [সুরা গাফির/মুমিন, আয়াত: ১৪]
.
সুরা ফাতিরে আল্লাহ বলেন—
.
وَ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِهٖ مَا یَمۡلِکُوۡنَ مِنۡ قِطۡمِیۡرٍ
.
‘‘তোমরা আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে ডাকো, তারা খেজুরের আঁটির আবরণের মালিকও নয়।’’ [সুরা ফাতির, আয়াত: ১৩]
.
❖ নেককার ব্যক্তির কাছে দু‘আ চাওয়া:
.
(১) যদি জীবিত কোনো নেককার ব্যক্তির কাছে এই নিয়তে দু‘আ চাওয়া হয় যে, ‘‘অমুক যেহেতু নেককার মানুষ, তাই উনার দু‘আ হয়তো আল্লাহ কবুল করবেন’’ তাহলে সমস্যা নেই। এভাবে দু‘আ চাওয়া বৈধ। কারণ মূলত আল্লাহর কাছেই দু‘আ করা হচ্ছে, ব্যক্তির কাছে দু‘আ করা হচ্ছে না, বরং দু‘আ চাওয়া হচ্ছে কেবল।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আমার মা বললেন,
‘‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আনাস আপনারই খাদেম। আপনি তার জন্য দু‘আ করুন।’’ তিনি দু‘আ করলেন, ‘‘ইয়া আল্লাহ! আপনি তার সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিন। আর তাকে আপনি যা কিছু দান করেছেন, তাতে বরকত দান করুন।’’
[ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫৯০৪]
এই দু‘আর বরকতে আনাস (রা.) বিপুল সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের অধিকারী হন।
.
(২) আর যদি সেই নেককার ব্যক্তিটি মৃত হয়, তাহলে তার কাছে দু‘আ করা তো যাবেই না, এভাবে দু‘আ চাওয়াও যাবে না। কারণ মৃত ব্যক্তি জীবিত ব্যক্তির কথা শুনতে পারে না এবং তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
.
وَمَا أَنتَ بِمُسْمِعٍ مَّن فِي الْقُبُورِ
.
‘‘আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নন।’’ [সুরা ফাতির, আয়াত: ২২]

==============

Comments

Popular posts from this blog

রাসুল (সাঃ) রাওজা জিয়ারতের ক্ষেত্রে করনীয় ও বর্জনীয়

নবিজির প্রতি ভালোবাসার তীব্রতা