রাসুল (সাঃ) রাওজা জিয়ারতের ক্ষেত্রে করনীয় ও বর্জনীয়
"আমার ঘর এবং মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটুকু জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।"—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই বাণীই প্রমাণ করে রাউদা শরিফের মহিমান্বিত মর্যাদা। এই পবিত্র জান্নাতের বাগানে দাঁড়িয়ে একজন মুমিনের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাউদা জিয়ারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো।:-
✔️ রাউদা জিয়ারতের করণীয় দিকসমূহ (যা করবেন)
রাউদা শরিফ জিয়ারতের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন এবং সুন্নাহর অনুসরণ।
১. নিয়ত খাঁটি করা: শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজা জিয়ারত ও মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা।
২. নম্রতা ও গাম্ভীর্য বজায় রাখা: অত্যন্ত বিনয়, নম্রতা এবং অন্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করা।
৩. রিয়াজুল জান্নাহ-এ সালাত আদায়: রাউজাতে মূল অংশ (যা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হুজরা মোবারক থেকে তাঁর মিম্বার পর্যন্ত বিস্তৃত) সম্পর্কে রাসুল ﷺ বলেছেন:
> "আমার ঘর এবং আমার মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটুকু জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।" (সহীহ বুখারী)
> তাই এখানে সুযোগ পেলে দুখুলুল মসজিদ আদায় করা যায়।
৪. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সালাম পেশ করা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শান্ত ও নিচু কণ্ঠে (চিৎকার না করে) সালাম পেশ করা। যেমন:
> *"আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ"
৫. আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর প্রতি সালাম: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সালাম শেষে তাঁর ডান পাশে থাকা প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং এরপর হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর প্রতি সালাম পেশ করা।
৬.বেশি বেশি দরুদ পাঠ: মদিনায় অবস্থানকালীন পুরোটা সময় এবং বিশেষ করে জিয়ারতের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা।
❌রাউদা জিয়ারতের বর্জনীয় দিকসমূহ (যা থেকে বিরত থাকে উচিত)
জিয়ারতের সময় আবেগের অতিশয্যে অনেকে এমন কিছু কাজ করে বসেন যা শরিয়তসম্মত নয়, বরং কোনো কোনোটি শিরক বা বিদআতের পর্যায়ে পড়ে। এগুলো থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকতে হবে:
১. উচ্চস্বরে কথা বলা বা শোরগোল করা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র রওজার সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা বা চিৎকার করে সালাম দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
> "হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না..." (সূরা আল-হুজুরাত: ২)
২. রওজা মোবারক বা দেয়াল স্পর্শ ও চুম্বন করা: বরকতের আশায় রওজা মোবারকের গ্রিল, দেয়াল বা মিম্বার স্পর্শ করা, জড়াজড়ি করা বা সেখানে চুম্বন করা বিদআত। সাহাবায়ে কেরাম বা তাবেয়ীদের কেউ এমনটা করেননি।
৩. রওজার দিকে মুখ করে দোয়া করা: দোয়া কেবল আল্লাহর কাছেই করতে হয়। রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উসিলা বা মাধ্যম দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যাবে, কিন্তু রওজার দিকে মুখ করে হাত তুলে মোনাজাত করা অনুচিত। দোয়া করার সময় কেবল কেবলামুখী (কাবার দিকে) হয়ে হাত তুলতে হবে।
৪. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে সরাসরি কিছু চাওয়া:এটি সবচেয়ে মারাত্মক ভুল। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে সন্তান, সুস্থতা, রিজিক বা ক্ষমা প্রার্থনা করা স্পষ্ট **শিরক**। কারণ দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে শুধু তাঁর শাফায়াত (সুপারিশ) কামনা করা যেতে পারে আল্লাহর দরবারে পেশ করার জন্য।
৫. রওজা মোবারককে সেজদা করা: রওজা মোবারকের দিকে বা সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে মাথা নত করা বা সেজদা করা হারাম। সেজদা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য।
৬. রওজা মোবারক তাওয়াফ করা:কাবার মতো করে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজা মোবারকের চারপাশে চক্কর দেওয়া বা তাওয়াফ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও বিদআত।
৭. ছবি বা সেলফি তোলায় ব্যস্ত থাকা: বর্তমানে রিয়াজুল জান্নাহ বা রওজার সামনে গিয়ে ছবি তোলা, ভিডিও করা বা লাইভে যাওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়। এতে জিয়ারতের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট হয় এবং ইবাদতের একাগ্রতা ও রিয়া (লোকদেখানো আমল) এর গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংক্ষেপে মূল কথা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বুকে নিয়ে, সুন্নাত পদ্ধতিতে জিয়ারত সম্পন্ন করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব। কোনো অবস্থাতেই যেন আবেগের বশে শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে
Comments
Post a Comment