মিনার তাবু থেকে একটি জীবন্ত উপলব্ধি

 মিনার তাবু থেকে একটি জীবন্ত উপলব্ধি

নিজেকে অনেক ধিক্কার দিচ্ছিলেন বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ডাক্তার (সরাকারি মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন।
পবিত্র মিনার তাবু। চারদিকে লাখো লাখো আল্লাহর মেহমানের লাব্বাইক ধ্বনি। হজের এই ক্লান্তিকর কিন্তু আত্মিক প্রশান্তির সফরে আমার ডান পাশে বসে আছেন বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত স্বনামধন্য ও সদ্য রিটায়ার্ড সরকারি মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল। পেশাগত জীবনে যিনি হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন, ব্যস্ততম সময় পার করেছেন মানবসেবায়। আরা বাম পাশের বিছানায় ৭২ বছর বয়সী এক আংকেল।
হঠাৎ করেই দেখি ডাক্তার সাহেবের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিয়ে, ভীষণ অনুতপ্ত হয়ে তিনি বলছিলেন— "আমার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আরও আগে কেন হজে আসলাম না!"
গতকাল আমাদের হজের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল মুজদালিফা থেকে হেঁটে জামারাতে এসে বড় শয়তানকে প্রতীকী পাথর মারা। আমার ঘড়ির হিসেবে প্রায় ১৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ।
৪৪ বছর বয়সী একজন সুস্থ, সুঠাম দেহের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমার আর আমার স্ত্রীর (লুবনা) পা দুটো যখন আর চলছিল না, যখন মনে হচ্ছিল একটু বসতে পারলে পরম শান্তি পেতাম— তখন মনের কোণে একটা প্রশ্ন উঁকি দিল:
আমার এই বয়সেই যদি এত কষ্ট হয়, তবে যারা ৬০, ৭০ বা ৭৫োর্ধ্ব, কিংবা যারা অসুস্থ— তাদের কী অবস্থা হচ্ছে?
জামারার কাজ শেষ করে যখন মিনার তাবুতে ফিরলাম, তখন আমার ডান পাশের সেই প্রিন্সিপাল স্যারকে দেখলাম উনার বিসানায় বসে কাঁদছেন।
ফুসফুসের জটিল রোগ (ILD)-এ আক্রান্ত হওয়ার কারণে গত ৬ মাস ধরে উনাকে প্রায়ই অক্সিজেন সাপোর্ট নিতে হয়। তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে তিনি নিজে হেঁটে বা হুইল চেয়ারে করে জামারাতে পাথর মারতে যেতে পারেননি।
তিনি আফসোস করে বলছিলেন, "সারাদিন শুধু রোগী আর রোগী! একবার সরকারি হাসপাতাল, আবার প্রাইভেট চেম্বার— এই নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। অথচ এই হজ যদি আরও আগে, শরীরে শক্তি থাকতে আসতাম, তবে আজ আমার এই অবস্থা হতো না।"
আমি উনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, "স্যার, আপনি তো মানবসেবাই করেছেন।"
উনি যা উত্তর দিলেন, তা আমার চোখ খুলে দিল। উনি বললেন
— "ইফতি ভাই, এই হজ করাটা আমার ওপর 'ফরজ' ছিল, আর রোগী দেখা ছিল আমার 'নফল' ইবাদত। ফরজের আগে নফলকে প্রাধান্য দেওয়া যে আমার ভুল ছিল, এই বোধটা আসা আজ বড্ড জরুরি ছিল।"
আমার বাম পাশে আছেন ৭২ বছর বয়সী আরেকজন প্রবীণ আঙ্কেল। বার্ধক্য আর অসুস্থতা উনাকে কতটা কাবু করেছে, তা আজ সকালে টের পেলাম। ফজরের নামাজের জন্য বারবার ডাকার পরও উনি উঠতে পারলেন না।
আমরা বিছানাতেই নামাজ শেষ করে যখন একটু ফ্রেশরুমে গেলাম, ফিরে এসে দেখি উনার বিছানাটা ফাঁকা, উনিও নেই।
খোঁজ নিয়ে জানলাম, অশ্ব (Piles) রোগের কারণে উনি বিছানাতেই মলত্যাগ করে ফেলেছেন। উনার মোয়াল্লেম এসে উনাকে পরিষ্কার করতে নিয়ে গেছেন। একটু পর যখন তিনি ফ্রেশ হয়ে ফিরে এলেন, উনার চেহারায় এক চরম অসহায়ত্ব।
এখন সবাই হজের আরেকটি প্রধান ফরজ কাজ— 'তাওয়াফ ও সাঈ' করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আঙ্কেল, যাবেন না?"
তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ও মলিন মুখে উত্তর দিলেন, "না রে বাবা, পারবো না। আমাকে দিয়ে আর হবে না..."
হজের এই গুরুত্বপূর্ণ রুকনগুলো শরীর সায় না দিলে আদায় করা কতটা কঠিন, তা আজ চোখের সামনে দেখছি। মহান আল্লাহ নিশ্চয়ই উনার অক্ষমতাকে ক্ষমা করে উনার হজ কবুল করবেন।
আমার উপলব্ধি: "পা থাকতে হেঁটে নাও, সময় থাকতে চলে এসো"
মিনার এই তাবু, ডাক্তার স্যারের অশ্রু আর বৃদ্ধ আঙ্কেলের অসহায়ত্ব আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি দিয়ে গেল।
হজ কেবল একটা ইবাদত নয়, হজ হলো এক প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার পরীক্ষা। এটি যেমন পরম ভালোবাসার জার্নি, তেমনি চরম কষ্টের পরীক্ষা।
আমাদের অনেকের মধ্যেই একটা ভুল ধারণা থাকে— "সংসারের সব দায়িত্ব শেষ করি, বয়স হোক, তারপর শেষ বয়সে গিয়ে আল্লাহর ঘরে ডাকব।" কিন্তু ততদিনে হয়তো টাকা থাকবে, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে তাওয়াফ করার মতো পায়ের শক্তি কিংবা মিনার তীব্র গরমে টিকে থাকার মতো ফুসফুসের ক্ষমতা থাকবে না।
হজে আসলে জীবনের হিসাব বদলে যায়। আল্লাহর সাথে যোগাযোগ নিবিড় হয়, বরকত নেমে আসে জীবনে, যা আমি নিজে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি (সে গল্প নাহয় আরেকদিন বলবো)।
মোরাল অব দ্যা স্টোরি
হে আমার ভাই ও বোনেরা, যাদের আল্লাহ তাআলা আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য দিয়েছেন— দেরি করবেন না। ক্যারিয়ার, ব্যবসা, কিংবা ভবিষ্যতের অজুহাতে ফরয ইবাদতকে পিছিয়ে দেবেন না।
যৌবনের শক্তিতে আল্লাহর ঘরে লাব্বাইক বলার যে তৃপ্তি, তা হুইলচেয়ারে বসে আক্ষেপের অশ্রুঝরার চেয়ে কোটি গুণ শ্রেয়।
সামর্থ্য হওয়ার সাথে সাথেই হজের সিদ্ধান্ত নিন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক সময়ে, সুস্থ শরীরে উনার পবিত্র ঘর জিয়ারত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

রাসুল (সাঃ) রাওজা জিয়ারতের ক্ষেত্রে করনীয় ও বর্জনীয়

দোয়া

নবিজির প্রতি ভালোবাসার তীব্রতা