কাবার তাওয়াফের সাত চক্করের বিস্তারিত দোয়া পরিকল্পনা
কাবার তাওয়াফে সাত চক্কর কিভাবে করতে পারেন, এটা জাস্ট একটা প্রস্তাবনা, আপনি চাইলে এটা ফলো করতে পারেন । অথবা এটা শরীয়ত সম্মত উপায়ে আপনার ইচ্ছাধীন উপায়ও করতে পারেন ।
১ম : প্রথম চক্কর আপনি আল্লাহর প্রশংসা, আল্লাহর বড়ত্ব, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, আল্লাহর জিকির, কোরআন তেলাওয়াত মাধ্যমে পূর্ণ করতে পারেন । আল্লাহর কাছে চাওয়ার সুন্নাহ সম্মত উপায় হচ্ছে প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করা ।
২য় : দ্বিতীয় চক্কর পুরোটা আপনি কাটাতে পারেন নবীজির প্রতি দুরুদ পড়ে । নামাজে আমরা যে দরুদ পরি সেই দরুদ অথবা যত প্রকার দুরুদ আপনার জানা আছে । চাইলে সবচেয়ে ছোট্ট দরুদ 'সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ' এটাও বলতে পারেন ।
৩য় : আল্লাহর রাসুল সা: বলেছেন দোয়া সবসময় নিজ থেকে শুরু করতে হয় । নিজের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন । আল্লাহ শুকরিয়া আদায় করবেন । এবং আপনার যত প্রকার চাওয়া আছে আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নিবেন ।
৪র্থ : তাওয়াফের এই পর্বে আপনি আপনার বাবা-মা, স্ত্রী সন্তান, শশুর শাশুড়ি, আপনার আত্মীয়-স্বজন যারা বেঁচে আছেন, যারা চলে গেছেন সবার জন্য দোয়া করবেন ।
৫ম : এই ধাপের সাথে দোয়া করবেন আপনার বন্ধুবান্ধব, সারা পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহ, যারা আপনার কাছে দোয়া চেয়েছেন । অনেকে নাম ধরে দোয়া করতে বলেন , নাম ধরে চেষ্টা করুন এবং আপনার জানাশোনা যারা বিপদগ্রস্ত আছে, যারা অসুস্থ, ঋণগ্রস্ত সকলের জন্য দোয়া করতে পারেন ।
অনেকের নাম ধরে দোয়া চাইতে বলেন, আসলে এই মুহূর্তগুলোতে সবসময় নাম মনে আসে না । তখন এভাবে বলতে পারেন 'আল্লাহ আপনার অনেক বান্দা নাম ধরে দোয়া চাইছেন , আমার মনে নাই আপনি জানেন, আপনি সেই নামগুলোর সকলের ইচ্ছা পূরণ করে দেন ।
আপনার দোয়ায় অবশ্যই চ্যানেল রাখবেন ভারতের নির্যাতিত নিপীড়িত মুসলিমদের, অবশ্যই হাত তুলবেন গাজার জন্য । যারা জেলে আছে, যার বাবা নেই, স্বামী নেই, ঘরে খাবার নেই, যারা অসুস্থ, সারা পৃথিবীতে যারা যুদ্ধ বিধ্বস্ত আপনার দোয়ায় তারা যেন অবশ্যই শামিল থাকে ।
৬ষ্ঠ : এই চক্করে আবার নবীজির প্রতি দুরুদ পড়ে পূর্ণ করতে পারেন ।
৭ম : শেষ চক্করে আবার আল্লাহর প্রশংসা, তাসবিহ , জিকির করে শেষ করতে পারেন ।
আর প্রতি চক্করে অবশ্যই রোকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত 'রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানা, ওয়া ফিল আখিরাতে হাসানা , ওয়া কিনা আজাবান্নার । এই দোয়াতে দুনিয়া এবং আখেরাতের আপনার সব চাওয়া পূর্ণ হয়ে গেছে ।
দোয়ার শুরুতে আল্লাহ প্রশংসা করতে হয়, দরুদ পড়তে হয় । তারপরে আল্লাহর কাছে নিজের জন্য ক্ষমা চাইতে হয়, শুকরিয়া আদায়, তারপর সব চাওয়া শেষ হলে আবার দুরুদ এবং আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শেষ করতে হয়, এটা সুন্নাহ সম্মত উপায় । তাহলে এক তাওয়াফে সাত চক্করে সুন্নাহ সম্মত উপায়ে আদায় হল, দোয়া কবুলের শর্ত পূরণ হলো আর এভাবে আপনার প্রতিটা চক্কর মনে রাখাটাও সহজ ।
দুনিয়ার দাতারা চাইলে বিরক্ত হন । আর আল্লাহ না চাইলে রাগ হন । দোয়ার বিউটি কি জানেন ? আল্লাহ দিবেন বলেই আপনাকে চাওয়ার তৌফিক দিয়েছেন । আর তাই চাওয়াটা যেন সুন্দর হয় ।
আমরা যেন সুন্দর করে চাইতে পারি, আপনি আমাদের অব্যক্ত চাওয়া গুলোও পূর্ণ করে দেন - ইয়া রব।
====================
১ম চক্কর: আল্লাহর প্রশংসা, তাসবিহ, জিকির ও মহিমা বর্ণনা
শুরু করুন: بِسْمِ اللهِ، وَاللهُ أَكْبَرُ
বাংলা: বিসমিল্লাহি, আল্লাহু আকবার।
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
পড়তে পারেন: سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ وَلَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র, সকল প্রশংসা আল্লাহর, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
এরপর হৃদয় থেকে বলুন: হে আল্লাহ, আপনি আসমান-জমিনের মালিক। আপনি ছাড়া আমার কেউ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আপনি আমাকে দেখছেন, আপনি আমার অন্তরের প্রতিটি কষ্ট জানেন। আপনি আর-রহমান, আর-রহিম, আল-মালিক, আল- ওয়াহহাব। হে আল্লাহ, আমি আপনার দরজায় এসেছি খালি হাতে, কিন্তু পূর্ণ আশা নিয়ে। আপনি আমার উপর রহম করুন, আমাকে আপনার নৈকট্য দান করুন।
২য় চক্কর: দরূদ শরীফ
পড়ুন: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা আলে মুহাম্মাদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ করুন।
এরপর বলুন: হে আল্লাহ, আপনি নবীজি ﷺ এর উপর অগণিত রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। আমাদের হৃদয়ে তাঁর ভালোবাসা বৃদ্ধি করুন। তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করার তাওফিক দিন। হাশরের ময়দানে তাঁর শাফায়াত নসিব করুন। কাউসারের হাউজ থেকে তাঁর হাতে পানি পান করান।
৩য় চক্কর: নিজের জন্য দোয়া:
হে আল্লাহ, আমি আপনার দুর্বল বান্দা। আমার গুনাহ আপনি জানেন, আমার লুকানো কান্নাও আপনি জানেন। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমার অন্তরের অশান্তি দূর করুন। আমার রিজিকে বরকত দিন। আমার ঋণ সহজে পরিশোধের ব্যবস্থা করুন। আমার হালাল রিজিক বৃদ্ধি করুন। আমার দুনিয়া ও আখিরাত সুন্দর করে দিন। আমার সকল নেক মনবাসনা পূর্ণ করুন, যদি তাতে কল্যাণ থাকে। আমাকে অপমান, অসহায়ত্ব ও মানুষের মুখাপেক্ষিতা থেকে হেফাজত করুন। আমার অন্তরকে প্রশান্ত করুন। আমাকে ঈমানের সাথে জীবন ও মৃত্যু দান করুন।
৪র্থ চক্কর: পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের জন্য
হে আল্লাহ, আমার বাবা-মাকে ক্ষমা করুন। তাদের কবর নূরে ভরে দিন। যদি জীবিত থাকেন, তাদের সুস্থতা, হায়াত ও ঈমান বৃদ্ধি করুন। আমার স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনকে হেফাজত করুন। আমাদের পরিবারে ভালোবাসা, রহমত ও দ্বীনের পরিবেশ দিন। আমার সন্তানদের নেককার, শিক্ষিত, সম্মানিত ও কুরআনের পথে পরিচালিত করুন। তাদের চোখ, অন্তর ও চরিত্র পবিত্র রাখুন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা দিন।
৫ম চক্কর: উম্মাহ, অসহায় ও মজলুমদের জন্য
হে আল্লাহ, সারা পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহর উপর রহম করুন। ফিলিস্তিন, গাজা, কাশ্মীর, ভারতসহ পৃথিবীর সকল নির্যাতিত মুসলমানকে হেফাজত করুন। যারা যুদ্ধ, ক্ষুধা, কারাগার, নির্যাতন ও ভয়ের মধ্যে আছে, আপনি তাদের সাহায্য করুন। যাদের ঘরে খাবার নেই, তাদের রিজিক দিন। যারা অসুস্থ, তাদের শিফা দিন।
যারা ঋণগ্রস্ত, তাদের ঋণমুক্ত করুন। যারা সন্তান হারিয়েছে, স্বামী হারিয়েছে, বাবা-মা হারিয়েছে, তাদের ধৈর্য দিন। হে আল্লাহ, যারা আমার কাছে দোয়া চেয়েছে, যাদের নাম আমার মনে নেই, আপনি তাদের সবাইকে রহম করুন এবং তাদের হালাল আশা পূরণ করুন।
৬ষ্ঠ চক্কর: আবার দরূদ ও ভালোবাসার দোয়া
দরূদ পড়ুন
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা আলে মুহাম্মাদ,
কামা সাল্লাইতা ‘আলা ইব্রাহীমা ওয়া ‘আলা আলে ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামিদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা আলে মুহাম্মাদ,
কামা বারাকতা ‘আলা ইব্রাহীমা ওয়া ‘আলা আলে ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামিদুম মাজীদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বরকত দান করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
এরপর বলুন:হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে নবীজি ﷺ এর সুন্নাহর উপর দৃঢ় করুন। আমাকে তাঁর আদর্শে চলার তাওফিক দিন। আমার পরিবারকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করুন। হাশরের দিনে আমাকে নবীজি ﷺ থেকে দূরে রাখবেন না। আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
৭ম চক্কর: সমাপনী প্রশংসা, তাওয়াক্কুল ও চূড়ান্ত দোয়া
পড়ুন: الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল ‘আলামিন।
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল জগতের প্রতিপালক।
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম।
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র এবং তাঁরই প্রশংসা। মহান আল্লাহ কতই না পবিত্র।
এরপর বলুন: হে আল্লাহ, আমি আমার সব দুঃখ, ভয়, চাওয়া ও ভবিষ্যৎ আপনার হাতে সোপর্দ করলাম। আপনি আমার জন্য যা উত্তম, সেটাই নির্ধারণ করুন। আমার জীবনের ভুলগুলো ক্ষমা করুন। আমার মৃত্যু ঈমানের সাথে দিন। মদিনায় মৃত্যু নসিব করুন। কিয়ামতের দিন আমাকে আরশের ছায়া দিন। বিনা হিসাবে জান্নাত দান করুন। আমাকে, আমার পরিবারকে ও উম্মাহকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের অব্যক্ত কান্না ও অপ্রকাশিত চাওয়াগুলোও কবুল করুন। আমিন।
প্রতি চক্করে রোকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত
আরবি: رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার।
অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।
Comments
Post a Comment